দুর্বৃত্তায়ন রোধে আত্মশুদ্ধি ও রমজান

দুর্বৃত্ত বলতে সাধারণত দুশ্চরিত্রের ব্যক্তিকে বোঝায়। যে নানা অসৎ বা সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। তাই দুর্বৃত্তায়নের অর্থ দাঁড়ায় অসৎ, অনৈতিক বা সমাজবিরোধী কাজের বিস্তার ও তার সামাজিক স্বীকৃতি লাভ। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সংকটে বাংলাদেশে এমনই এক সর্বগ্রাসী দুর্বৃত্তায়নের চিত্র গণমাধ্যমে ফুটে উঠেছে। অসহায় ও দুস্থ মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত চাল, তেলসহ অন্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। যা দেশের সামগ্রিক সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে। সর্বগ্রাসী এই দুর্বৃত্তায়ন রোধে ইসলাম ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুদ্ধির চেষ্টার কথা বলেছে এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আইন প্রয়োগ করে তা নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দিয়েছে। মূলত ব্যক্তি পর্যায়ের আত্মশুদ্ধি ছাড়া একটি সুষ্ঠু সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। পবিত্র রমজান মানুষকে সেই আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়।

আত্মশুদ্ধি কী ও কেন?

‘তাজকিয়াতুন নফস’ বা আত্মিক পরিশুদ্ধি ইসলামের মৌলিক লক্ষ্য। ইসলামের সব নিয়মতান্ত্রিক ইবাদতের সঙ্গে এই লক্ষ্য জড়িত। কেননা আত্মার পরিশুদ্ধতার ওপরই ব্যক্তির কাজের নিষ্ঠা ও তার যাবতীয় পুরস্কার-প্রতিদান নির্ভরশীল। পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ তাআলা বারবার আত্মশুদ্ধি অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাকে সাফল্য ও ব্যর্থতার পরিমাপক নির্ধারণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে পরিশুদ্ধ করল সে-ই সফল, আর ব্যর্থ সে-ই যে নিজের অন্তঃকরণ কলুষিত করল।’ (সুরা : আশ-শামস, আয়াত : ৯-১০)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সাবধান! মানুষের দেহে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে, যদি তা পরিশুদ্ধ হয় তবে পুরো দেহই পরিশুদ্ধ হয়; আর যদি তা দূষিত হয়ে যায়, তবে পুরো দেহই দূষিত হয়ে যায়। আর সেটা হলো কলব বা আত্মা।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস ২৭৬২)

আত্মশুদ্ধির দুটি দিক

আত্মশুদ্ধির বিষয়টি দুভাবে উপস্থাপন করা যায়। যেমন—এক. ইতিবাচক : উত্তম গুণাবলি দ্বারা আত্মার উন্নতি সাধন করা। তা হলো, তাওহিদ, ইখলাস বা নিষ্ঠা, আল্লাহভীতি, তাওয়াক্কুল, তাওবা, শোকর বা কৃতজ্ঞতা, আল্লাহর প্রতি আস্থা ও আশা, শালীনতা, বিনয়-নম্রতা, ধৈর্য, মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্নেহ, মানুষের প্রতি দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতি, ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ, পরোপকার ইত্যাদি গুণ অর্জন করা।

দুই. নেতিবাচক : যাবতীয় পাপ, অন্যায় ও অপবিত্র কাজ থেকে মুক্ত হওয়া। যেমন—শিরক, রিয়া বা প্রদর্শনপ্রিয়তা, অহংকার, আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা, হিংসা, ঘৃণা, কৃপণতা, ক্রোধ, পরনিন্দা, কুধারণা, দুনিয়ার মোহ, পরকালের ওপর পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেওয়া, জীবনের প্রতি উদাসীনতা, অর্থহীন কাজ করা, অনধিকারচর্চা ইত্যাদি।

দুর্বৃত্তায়ন রোধে আত্মশুদ্ধি ও রমজান

পরিশুদ্ধ আত্মার অধিকারী ব্যক্তির পক্ষে দুর্বৃত্ত হওয়া অসম্ভব। কেননা দুর্বৃত্তায়ন বলতে যা বোঝায়, তার সব কিছুই কোরআন-হাদিসে নিষিদ্ধ। আর রমজান আল্লাহভীতির মাধ্যমে সব ধরনের পাপ থেকে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জোগায়। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা মুত্তাকি (আল্লাহভীরু) হতে পারো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৩)

বিজ্ঞ আলেমরা বলেন, সুদ, ঘুষ, মিথ্যা, ধোঁকা, প্রতারণা, অশ্লীলতা, অন্যের অধিকার নষ্ট করা, গিবত ও পরচর্চার মতো গুনাহর কাজগুলো পরিহার না করলে বান্দার রোজা পূর্ণতা লাভ করে না। আর গুনাহ ত্যাগই তাকওয়ার মূল উদ্দেশ্য। হাদিসে এসেছে, ‘রোজা শুধু পানাহার ত্যাগ করা নয়; বরং তা হলো মিথ্যা, ভ্রান্ত ও অনর্থক জিনিস পরিহার করা।’ (শুআবুল ঈমান, হাদিস ৩৬৪৮)

দুর্বৃত্তায়নের মূলে রয়েছে আমানতের খেয়ানত। ব্যক্তি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে এবং সুযোগের অসদ্ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতি করে—যা সর্বতোভাবে খেয়ানত। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে আমানত তার মালিককে প্রত্যর্পণ করবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)

পরকালীন জীবনের স্মরণ ও প্রস্তুতি রমজানের আরেকটি শিক্ষা। মহানবী (সা.) বলেন, সেদিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কোনো আদমসন্তান এক কদমও নড়তে পারবে না; চাই সে নবী হোক কিংবা ওলি। তা হলো, ১. তুমি তোমার সারা জীবন কোন পথে কাটিয়েছ? ২. যৌবনকালে কোন আমল করেছ? ৩. ধন-সম্পদ কোন পথে উপার্জন করেছ? ৪. তা কোন পথে ব্যয় করেছ? ৫. দ্বিন ইসলাম সম্পর্কে যতটুকু জেনেছ, সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছ। (সুনানে তিরমিজি)

By admin

Leave a Reply